নাটোর-৪ আসন- তিন দলেই কোন্দল, কাটছে না মনোনয়ন ধোঁয়াশা
গুরুদাসপুর (নাটোর) সংবাদদাতা
কে পাচ্ছেন দলীয় প্রতিক। তিন দলেই চলছে এমন ধোঁয়াশা। আছে কোন্দলও। মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের নির্বাচনী এলাকায় তেমন গণসংযোগ চালাতে দেখা যাচ্ছে না। প্রচারণার চেয়ে মনোনয়ন প্রাপ্তির জন্য নেতারা জোর তদবির চালাচ্ছেন দলের উচ্চ পর্যায়ে। একারণে তৃণমূলে নেই নির্বাচনী রেষ।
আওয়ামী লীগে মনোনয়ন প্রত্যাশী আছেন তিন নেতা। বিএনপিতে দুইজন থাকলেও নির্বাচনী এলাকার বাহির থেকে প্রার্থী দেওয়ার দাবি রয়েছে। এছাড়া জাতীয় পার্টির দুই নেতাও মনোনয়নের জন্য মাঠে রয়েছেন।
আ’লীগে সাংসদ বিরোধী জোট- নাটোর-৪ গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম আসনে নাটোর জেলা আ’লীগের সভাপতি বর্তমান সাংসদ আব্দুল কুদ্দুস বিরোধী জোট গঠন করেছেন গুরুদাসপুর উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র শাহনেওয়াজ আলী ও বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী। এই দুই নেতা দুই উপজেলায় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
মূলত ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর থেকেই সাংসদ কুদ্দুসের সাথে গুরুদাসপুরের পৌর মেয়র উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহনেওয়াজ আলীর কোন্দল শুরু হয়। গত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় আব্দুল কুদ্দুস চার বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচত হওয়ার পর বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী মেয়র শাহনেওয়াজের সাথে মিলিত হয়ে পুনরায় সাংসদ বিরোধী অবস্থান নেন। এরপর থেকে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, সাংবাদিক সম্মেলনসহ একাধিকবার সাংসদ কুদ্দুসকে বয়কটের ঘটনা ঘটেছে। সেই কোন্দলের জেরে হামলা মামলার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে দলের একাধিক সূত্র বলছে, দুই উপজেলায় দুই নেতা সাংসদ কুদ্দুসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও মূলত উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ তৃণমূল নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশ তার সাথে রয়েছেন। নাটোর জেলা আ’লীগের সভাপতি সাংসদ আব্দুল কুদ্দুস দলের প্রবীন রাজনীতিবিদ। তিনি চারবার দলীয় প্রতিক নিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে মনোনয়ন না দেওয়া হলে এ আসনে নৌকার বিজয় হাত ছাড়া হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
মনোনয়ন প্রত্যাশী গুরুদাসপুর উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র শাহনেওয়াজ আলী ও নাটোর জেলা আ’লীগর স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী দাবি করেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দুই উপজেলার ছয়জন নৌকা প্রতিক পাওয়া প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপি’র প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন করেছেন সাংসদ কুদ্দুস। তাই সাংসদ কুদ্দুসকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলে এই আসনে আ’লীগের ভরাডুবি হবে। তাকে বাদ রেখে শাহনেওয়াজ এবং পাটোয়ারীর মধ্যে মনোনয়ন দেওয়া হলে দুই উপজেলা নেতা-কর্মীরা বিপুল ভোটে নৌকার বিজয় আনবে।
নাটোর জেলা আ’লীগের সভাপতি বর্তমান সাংসদ আব্দুল কুদ্দুস বলেন, তার জনপ্রিয়তায় একটা মহল ঈষান্বিত। বিশেষ সুবিধা না দেওয়ায় নির্বাচন আসলেই তারা নানান ষড়যন্ত্র শুরু করেন। জনসমর্থণের কারণেই এর আগে ৪ বার নির্বাচিত হয়েছেন। এবারো তাই হবে।
এদিকে মনোনয়ন নিয়ে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা অনড় অবস্থানে রয়েছেন। তারা বলছেন- জাতীয় পার্টি একক এবং মহাজোট থেকে নির্বাচন করলেও এ আসনে জাতীয় পার্টিকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। সেই প্রত্যাশায় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কাশেম সরকার ও শিল্পপতি আলাউদ্দিন মৃধা দলের মনোনয়ন চাইছেন। এলক্ষ্যে দুই উপজেলায় দুজন প্রার্থীই পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনসহ তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করতে মাঝে মাঝে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কাশেম সরকার বলেন, দলের সবুজ সংকেত নিয়েই নির্বাচনী মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। তবে তাদের মধ্যে কোন্দল নেই। মনোনয়ন তিনিই পাবেন। অপর প্রার্থী আলাউদ্দিন মৃধা বলেন, মনোনয়নের ব্যপারে তিনি শতভাগ আশাবাদি। একারণে তিনিও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
বিভক্ত বিএনপিতে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি- দলীয় কোন্দলে উপজেলা বিএনপি এখন তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দলের ভেতর উপদলীয় কোন্দলের ফলে তৃণমূল নেতা-কর্মীরা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। সাংগঠনিক কাজে পড়েছে ভাটা। দলের এমন পরিস্থিতিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনে দলীয় মনোনয়ন চাইছেন গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ, সাবেক সাংসদ এম মোজাম্মেল হক এবং নির্বাচনী এলাকার বিএনপি’ ও অঙ্গসংগঠনের একাংশের নেতা-কর্মীরা নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি কেন্দ্রিয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার দাবি তুলছেন। এখন মনোনয়নের জন্য দলের উচ্চ পর্যায়ে চলছে জোর তদবির। একারণে তৃণমূলে নেই নির্বাচনী প্রচারণা।
মূলত উপজেলা নির্বাচনের আগে ২০১৫ সালে সাবেক সাংসদ মোজাম্মেল হকের বাড়িতে দলের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে উপজেলা বিএনপি’র কমিটি গঠন নিয়ে দলীয় কোন্দলের সূত্রপাত। সে সময় দুলু আব্দুল আজিজকে সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করেন। এসময় মোজাম্মেল হক আব্দুল আজিজ ও সাবেক পৌর মেয়র আমজাদ হোসেন তিন ভাগে বিভক্ত হয়। পরে সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিুকুর রহমানের মৃত্যুর পর আমজাদ হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এরপর আমজাদ হোসেনের সাথে আব্দুল আজিজের মদভেদ হওয়ায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ, সাবেক সাংসদ এম মোজাম্মেল হক এবং উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আমজাদ বিচ্ছিন্নভাবে তিন মেরুতে রয়েছেন।
দলীয় সূত্রে জানাগেছে, দল ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর এ আসনের সাবেক সাংসদ এম. মোজাম্মেল হক এলাকা ছাড়া, বড়াইগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ একরামূল হক ২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর মারা যাওয়ার পর সেখানেও নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়। এরপর থেকে বড়াইগ্রামে দলীয় প্রতীক চাওয়ার মতো না থাকায় প্রার্থীতার রেষটা গুরুদাসপুরের ওপরেই পড়ছে।
দুই উপজেলার তৃণ নেতা-কর্মী বলছেন- গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রামের নেতা-কর্মীদের একাংশ দুলুকে প্রার্থী দেওয়ার দাবি জানালেও ইউনিয়ন, উপজেলা কমিটি এবং এর বাইরে থাকা সাধারণ নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ আব্দুল আজিজকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সমর্থন করে যাচ্ছেন।
গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক পৌর মেয়র মো. আমজাদ হোসেন ও বড়াইগ্রাম উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. হযরত আলী বলেন, গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম বিএনপি’র বর্তমান সংকট দূর করতে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকে এই আসনে প্রার্থী করার দাবি রয়েছে দুই উপজেলার সকল নেতা-কর্মীর।
গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল আজিজ বলেন, গঠনতন্ত্র মেনে তৃণমুল বিএনপির সমর্থন নিয়ে তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে রয়েছেন। তাঁর জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে দলের কতিপয় নেতা তার বিরুদ্ধে বিষোদগারে নেমেছেন।
সাবেক সাংসদ এম.মোজাম্মেল হক বলেন, দেশের পরিস্থিতির কারণে তিনি ঢাকায় থাকেন। তবে এলাকার নেতা-কর্মীদের সাথে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে।
জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, নাটোর-৪ আসনে নির্বাচন করা না করার সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে দলের একাংশের নেতা-কর্মীরা তাকে চাইছেন। দল মনোনয়ন দিলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তাছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশি নেতা আব্দুল আজিজ দলীয় সংকেত পেয়েই নির্বাচনি প্রচারনা চালাচ্ছেন। উপজেলার সভাপতি হিসাবে এ অধিকার তার রয়েছে।
মুক্ত প্রভাত/ হেনা আহমেদ